Associate Professor, Department of Radiation Oncology
National Institute of Cancer Research & Hospital (NICRH), Dhaka
অভিজ্ঞ ক্লিনিক্যাল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট
এই নিবন্ধটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত NCCN, ASTRO, ESTRO ও ESMO গাইডলাইন অনুসরণ করে রোগীদের সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে।

রেডিওথেরাপি কী? কখন প্রয়োজন, কীভাবে কাজ করে ও চিকিৎসা পদ্ধতি

⏱️ পড়তে সময় লাগবে: আনুমানিক ১৮–২০ মিনিট

এই রোগী নির্দেশিকায় রেডিওথেরাপি কী, কীভাবে কাজ করে, কখন প্রয়োজন হয়, বিভিন্ন ধরনের রেডিওথেরাপি, চিকিৎসার ধাপ, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, প্রস্তুতি, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন এবং চিকিৎসাকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সংক্ষেপে জানুন:

রেডিওথেরাপি কী?

রেডিওথেরাপি (Radiotherapy) হলো ক্যান্সারের একটি আধুনিক ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে উচ্চ-শক্তির রেডিয়েশন ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয় বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর ফলে ক্যান্সার কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় এবং টিউমার ছোট হতে বা নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।

রেডিওথেরাপির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি নির্দিষ্ট আক্রান্ত স্থানে লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা দেয়। অর্থাৎ, মূলত টিউমার এবং তার আশেপাশের প্রয়োজনীয় অংশে রেডিয়েশন দেওয়া হয়, যাতে সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি যতটা সম্ভব কম হয়।

বর্তমানে IMRT, VMAT, IGRT, SBRT ও ব্র্যাকিথেরাপির মতো আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নির্ভুল ও নিরাপদভাবে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, বিভিন্ন ধরনের টিউমারসহ অনেক ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রেডিওথেরাপি কীভাবে কাজ করে?

রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত উচ্চ-শক্তির বিকিরণ ক্যান্সার কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে ক্যান্সার কোষ বিভাজন ও বৃদ্ধি করতে পারে না এবং ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যায়। স্বাভাবিক কোষও কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে, তবে অধিকাংশ সুস্থ কোষ সময়ের সঙ্গে নিজেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম।

রেডিওথেরাপি শুরুর আগে CT Simulation এবং বিশেষ কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রতিটি রোগীর জন্য একটি নির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এরপর আধুনিক Linear Accelerator মেশিনের সাহায্যে টিউমারে প্রয়োজনীয় মাত্রার রেডিয়েশন অত্যন্ত নির্ভুলভাবে দেওয়া হয়। এতে ক্যান্সার কোষ কার্যকরভাবে ধ্বংস হয় এবং আশপাশের সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমানো যায়।

কখন রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়?

সব ক্যান্সার রোগীর রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয় না। রোগের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ Radiation Oncologist রেডিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা ও চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন।

রেডিওথেরাপির সুবিধা

রেডিওথেরাপি আধুনিক ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সার্জারি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে এটি এককভাবে অথবা সমন্বিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে IMRT, VMAT, IGRT, SBRT ও SRS-এর মতো উন্নত প্রযুক্তির কারণে রেডিওথেরাপি আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল, নিরাপদ এবং কার্যকর হয়েছে।

রেডিওথেরাপির সীমাবদ্ধতা

রেডিওথেরাপি ক্যান্সারের অত্যন্ত কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও এটি সব রোগীর জন্য বা সব ধরনের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। রোগের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, রোগীর শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে রেডিওথেরাপির উপযোগিতা নির্ধারণ করা হয়। তাই প্রতিটি রোগীর জন্য ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা (Personalized Treatment Plan) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিওথেরাপি বনাম কেমোথেরাপি: পার্থক্য কী?

রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি—উভয়ই ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি। তবে এদের কাজের ধরন, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং উদ্দেশ্য ভিন্ন। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দুটি চিকিৎসা একসঙ্গে (Concurrent Chemoradiotherapy) দেওয়া হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র একটি চিকিৎসাই যথেষ্ট হতে পারে। কোন চিকিৎসা প্রয়োজন হবে তা ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।

বিষয় রেডিওথেরাপি কেমোথেরাপি
চিকিৎসার ধরন উচ্চ-শক্তির রেডিয়েশন ব্যবহার করে নির্দিষ্ট স্থানে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ওষুধের মাধ্যমে সারা শরীরে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
কোথায় কাজ করে মূলত নির্দিষ্ট টিউমার বা আক্রান্ত স্থানে। সারা শরীরে (Systemic Treatment)।
কীভাবে দেওয়া হয় Linear Accelerator অথবা ব্র্যাকিথেরাপির মাধ্যমে। শিরায় (IV), মুখে খাওয়ার ওষুধ অথবা অন্যান্য পদ্ধতিতে।
চিকিৎসার সময়কাল প্রতিদিন কয়েক মিনিট; কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত। চক্র (Cycle) অনুযায়ী কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত।
প্রধান উদ্দেশ্য টিউমার সম্পূর্ণ নিরাময়, নিয়ন্ত্রণ অথবা উপসর্গ উপশম করা। ক্যান্সার কোষ ধ্বংস, রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমানো।
সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত চিকিৎসার স্থানে সীমাবদ্ধ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

কখন দুটি চিকিৎসা একসঙ্গে দেওয়া হয়?

কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি একসঙ্গে দেওয়া হলে চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে জরায়ুমুখ ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার এবং কিছু অন্যান্য ক্যান্সারে Concurrent Chemoradiotherapy আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

কোন চিকিৎসা আপনার জন্য উপযুক্ত?

সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রেডিওথেরাপি, কারও ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কেমোথেরাপি, আবার কারও ক্ষেত্রে সার্জারি, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা ইমিউনোথেরাপির সমন্বিত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই অভিজ্ঞ Clinical & Radiation Oncologist-এর পরামর্শ অনুযায়ী ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।

মনে রাখুন:

কোন কোন ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়?

বর্তমানে অনেক ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোগের ধরন ও স্টেজ অনুযায়ী এটি একক চিকিৎসা হিসেবে অথবা সার্জারি, কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি কিংবা ইমিউনোথেরাপির সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবহার করা হয়।

রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হবে কি না, কত ডোজ দেওয়া হবে এবং কতদিন চিকিৎসা চলবে—এসব বিষয় রোগের ধরন, স্টেজ, প্যাথলজি রিপোর্ট, ইমেজিং এবং রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তাই প্রতিটি রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা আলাদা হতে পারে।

রেডিওথেরাপির বিভিন্ন ধরন

রোগের ধরন, টিউমারের অবস্থান, আকার, স্টেজ এবং আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন ধরনের রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে বর্তমানে অনেক বেশি নির্ভুলভাবে টিউমারে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব, ফলে চিকিৎসার কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে কমেছে।

১. External Beam Radiotherapy (EBRT)

এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রেডিওথেরাপি পদ্ধতি। শরীরের বাইরে থাকা একটি Linear Accelerator (LINAC) থেকে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী টিউমারের দিকে উচ্চ-শক্তির রেডিয়েশন পাঠানো হয়। বর্তমানে স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার, মাথা ও ঘাড়ের ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সারসহ অধিকাংশ ক্যান্সারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

২. Three-Dimensional Conformal Radiotherapy (3D-CRT)

3D-CRT-তে CT Scan-এর মাধ্যমে টিউমারের ত্রিমাত্রিক (3D) ছবি তৈরি করে রেডিয়েশন পরিকল্পনা করা হয়। এটি প্রচলিত রেডিওথেরাপির তুলনায় অধিক নির্ভুল এবং সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম করে।

৩. Intensity-Modulated Radiotherapy (IMRT)

IMRT আধুনিক রেডিওথেরাপির অন্যতম উন্নত প্রযুক্তি। এতে বিভিন্ন দিক থেকে বিভিন্ন মাত্রার রেডিয়েশন দেওয়া যায়, ফলে টিউমারে প্রয়োজনীয় ডোজ পৌঁছায় কিন্তু আশেপাশের সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সর্বোচ্চ সুরক্ষা পায়। জটিল স্থানে অবস্থিত অনেক ক্যান্সারে IMRT বর্তমানে স্ট্যান্ডার্ড চিকিৎসার অংশ।

৪. Volumetric Modulated Arc Therapy (VMAT)

VMAT হলো IMRT-এর আরও উন্নত সংস্করণ। চিকিৎসার সময় Linear Accelerator রোগীর চারদিকে ঘুরে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অত্যন্ত নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন প্রদান করে। এতে চিকিৎসার সময় কম লাগে এবং রোগীর আরামও বৃদ্ধি পায়।

৫. Image-Guided Radiotherapy (IGRT)

IGRT-তে প্রতিদিন চিকিৎসা দেওয়ার আগে বিশেষ ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারের অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। এতে প্রতিদিন আরও নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব হয় এবং চিকিৎসার নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়।

৬. Stereotactic Body Radiotherapy (SBRT)

SBRT-তে খুব অল্প সংখ্যক সেশনে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন নির্ভুলভাবে ছোট টিউমারে দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যান্সার, লিভার, মেরুদণ্ড এবং কিছু মেটাস্ট্যাটিক টিউমারের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর।

৭. Stereotactic Radiosurgery (SRS)

SRS মূলত মস্তিষ্কের ছোট টিউমার, কিছু সৌম্য টিউমার এবং নির্দিষ্ট নিউরোলজিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। নামের মধ্যে "Surgery" থাকলেও এতে কোনো অস্ত্রোপচার করা হয় না; এটি অত্যন্ত নির্ভুল রেডিওথেরাপি।

৮. ব্র্যাকিথেরাপি (Brachytherapy)

ব্র্যাকিথেরাপিতে শরীরের ভেতরে টিউমারের খুব কাছাকাছি বা টিউমারের মধ্যেই বিশেষ রেডিওঅ্যাকটিভ উৎস স্থাপন করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। বিস্তারিত জানতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি: সম্পূর্ণ রোগী নির্দেশিকা পড়ুন।

মনে রাখুন:

রেডিওথেরাপি কতদিন দিতে হয়?

রেডিওথেরাপির সময়কাল সব রোগীর জন্য একরকম নয়। ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, চিকিৎসার উদ্দেশ্য (নিরাময়, নিয়ন্ত্রণ বা উপসর্গ উপশম) এবং ব্যবহৃত রেডিওথেরাপি প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার সময়কাল নির্ধারণ করা হয়। তাই একজন রোগীর চিকিৎসার সময় অন্যজনের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।

মনে রাখুন:

রেডিওথেরাপির মোট ডোজ, প্রতিদিনের ডোজ (Fraction) এবং চিকিৎসার সময়কাল আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুসরণ করে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া চিকিৎসার সময়সূচি পরিবর্তন বা মাঝপথে বন্ধ করা উচিত নয়।

রেডিওথেরাপির পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও ধাপসমূহ

রেডিওথেরাপি শুরু করার আগে প্রতিটি রোগীর জন্য একটি ব্যক্তিগত (Personalized) চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। রোগের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার ভিত্তিতে এই পরিকল্পনা করা হয়। আধুনিক রেডিওথেরাপির প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা হয় যাতে টিউমারে সর্বোচ্চ কার্যকর ডোজ দেওয়া যায় এবং আশেপাশের সুস্থ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যতটা সম্ভব সুরক্ষিত থাকে।

১. প্রথম বিশেষজ্ঞ পরামর্শ (Consultation)

প্রথম সাক্ষাতে Radiation Oncologist রোগীর সম্পূর্ণ চিকিৎসার ইতিহাস, বায়োপসি রিপোর্ট, CT Scan, MRI, PET-CT বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়ন করেন। এরপর রোগের স্টেজ অনুযায়ী রেডিওথেরাপি প্রয়োজন কিনা এবং কোন ধরনের রেডিওথেরাপি সবচেয়ে উপযুক্ত হবে তা নির্ধারণ করা হয়।

২. CT Simulation

CT Simulation হলো রেডিওথেরাপির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি। এই বিশেষ CT Scan-এর মাধ্যমে রোগীকে চিকিৎসার সময় যে অবস্থানে রাখা হবে, ঠিক সেই অবস্থানেই স্ক্যান করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ Immobilization Device বা Mask ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রতিদিন একই অবস্থানে নির্ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়।

৩. Target Delineation

CT Simulation-এর ছবি ব্যবহার করে Radiation Oncologist টিউমার এবং আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ (Organs at Risk) অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চিহ্নিত করেন। এই ধাপটি সঠিক না হলে চিকিৎসার কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা দুটিই প্রভাবিত হতে পারে।

৪. Treatment Planning

এরপর বিশেষ কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে একটি ব্যক্তিগত রেডিওথেরাপি পরিকল্পনা (Treatment Plan) তৈরি করা হয়। এতে কত ডোজ দেওয়া হবে, কতটি সেশন প্রয়োজন হবে, কোন দিক থেকে রেডিয়েশন দেওয়া হবে এবং কোন প্রযুক্তি (3D-CRT, IMRT, VMAT, IGRT বা SBRT) ব্যবহার করা হবে তা নির্ধারণ করা হয়।

৫. Quality Assurance (QA)

চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগে মেডিকেল ফিজিসিস্ট পুরো পরিকল্পনাটি যাচাই করেন। এতে নিশ্চিত করা হয় যে পরিকল্পিত ডোজ ঠিকভাবে মেশিন থেকে দেওয়া সম্ভব এবং রোগী নিরাপদভাবে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারবেন।

৬. প্রতিদিনের রেডিওথেরাপি

রোগী নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা কেন্দ্রে আসেন। প্রয়োজন হলে প্রতিদিন IGRT-এর মাধ্যমে টিউমারের অবস্থান পুনরায় নিশ্চিত করা হয়। এরপর Linear Accelerator ব্যবহার করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়। চিকিৎসা চলাকালীন রোগী কোনো ব্যথা অনুভব করেন না এবং রেডিয়েশন দেখা বা অনুভব করা যায় না।

৭. চিকিৎসাকালীন নিয়মিত মূল্যায়ন

রেডিওথেরাপি চলাকালীন নিয়মিতভাবে Radiation Oncologist রোগীর শারীরিক অবস্থা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং চিকিৎসার অগ্রগতি মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজন হলে খাদ্যাভ্যাস, ওষুধ বা সহায়ক চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা হয়।

৮. চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ফলো-আপ

রেডিওথেরাপি শেষ হওয়ার পরও নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা, CT Scan, MRI, PET-CT অথবা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে। পাশাপাশি সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন এবং ক্যান্সার পুনরায় ফিরে এসেছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা হয়।

রোগীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ:
মনে রাখুন:

রেডিওথেরাপির পুরো প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ব্যথাহীন এবং প্রতিটি ধাপ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সম্পন্ন করা হয়। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ করলে সর্বোত্তম ফলাফল পাওয়া যায়।

রেডিওথেরাপি নেওয়ার সময় কি ব্যথা অনুভূত হয়?

রেডিওথেরাপি নেওয়ার সময় অধিকাংশ রোগীর কোনো ব্যথা বা অস্বস্তি হয় না। এটি অনেকটা এক্স-রে করার মতো একটি প্রক্রিয়া। চিকিৎসার সময় আপনি একটি বিশেষ টেবিলে স্থির হয়ে শুয়ে থাকবেন, আর রেডিওথেরাপি মেশিন (Linear Accelerator) শরীরের নির্ধারিত অংশে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন প্রদান করবে। চিকিৎসার সময় আপনি সাধারণত কিছুই অনুভব করবেন না।

মনে রাখুন:

বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (External Beam Radiotherapy) নেওয়ার পর শরীরে কোনো রেডিয়েশন থেকে থাকে না। তাই চিকিৎসা শেষে পরিবারের সদস্য, শিশু বা গর্ভবতী নারীর সংস্পর্শে থাকা সম্পূর্ণ নিরাপদ।

রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

রেডিওথেরাপি একটি নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি হলেও চিকিৎসার সময় বা পরে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন নির্ভর করে কোন অঙ্গে রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে, মোট রেডিয়েশন ডোজ, চিকিৎসার সময়কাল, রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং কেমোথেরাপি একসঙ্গে দেওয়া হচ্ছে কিনা তার ওপর।

আধুনিক IMRT, VMAT ও IGRT প্রযুক্তির কারণে বর্তমানে অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক কম এবং বেশিরভাগই সাময়িক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

সাধারণ স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্যাগুলো চিকিৎসা শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ধীরে ধীরে কমে যায়।

সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক মাস বা কয়েক বছর পরে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। তবে আধুনিক রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার ঝুঁকি বর্তমানে অনেক কম।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানোর উপায়

রোগীর সচেতনতা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে অধিকাংশ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

রেডিওথেরাপি শুরুর আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?

রেডিওথেরাপি শুরু হওয়ার আগে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা শুরু করার আগে Radiation Oncologist আপনার রোগের ধরন, স্টেজ, পূর্ববর্তী চিকিৎসা, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করবেন। চিকিৎসা চলাকালীন কোনো সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসককে জানানো এবং নিয়মিত ফলো-আপে থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিওথেরাপি চলাকালীন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন

রেডিওথেরাপি গ্রহণের সময় সঠিক খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন চিকিৎসা সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোগভেদে বিশেষ খাদ্য পরামর্শ ভিন্ন হতে পারে, তাই ব্যক্তিগতভাবে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

খাদ্যাভ্যাস

জীবনযাপন

কখন দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?

রেডিওথেরাপি চলাকালীন বা পরে নিচের যেকোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

মনে রাখুন:

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

রেডিওথেরাপি ক্যান্সারের চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সব রোগীর জন্য একই চিকিৎসা প্রযোজ্য নয়। রোগের ধরন, স্টেজ, প্যাথলজি রিপোর্ট, টিউমারের অবস্থান, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে প্রতিটি রোগীর জন্য পৃথক চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। তাই বিশেষজ্ঞ Radiation Oncologist-এর পরামর্শ ছাড়া রেডিওথেরাপি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

বর্তমানে অনেক ক্যান্সারের ক্ষেত্রে সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি এবং ইমিউনোথেরাপি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়। আধুনিক Multidisciplinary Team (MDT) পদ্ধতির মাধ্যমে প্রতিটি রোগীর জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

রেডিওথেরাপি একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ও নির্ভুল চিকিৎসা পদ্ধতি। সঠিক রোগ নির্ণয়, উন্নত প্রযুক্তি এবং অভিজ্ঞ Radiation Oncologist-এর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা গ্রহণ করলে অধিকাংশ রোগী নিরাপদভাবে সম্পূর্ণ চিকিৎসা শেষ করতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে ভালো ফলাফল পাওয়া সম্ভব।

আপনি বা আপনার পরিবারের কেউ যদি রেডিওথেরাপি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান অথবা চিকিৎসা পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন হয়, তাহলে ডাঃ রুবিনা সুলতানা-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। রোগের ধরন, স্টেজ এবং আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রদান করা হয়।

ব্রেস্ট ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার: লক্ষণ, চিকিৎসা ও রোগী নির্দেশিকাসমূহ নিচে দেখুন

রেডিওথেরাপি ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রেডিওথেরাপির পাশাপাশি রোগের লক্ষণ, স্ক্রিনিং, রোগ নির্ণয়, স্টেজভিত্তিক চিকিৎসা, ব্র্যাকিথেরাপি, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং রোগীদের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের রোগী নির্দেশিকাগুলো পড়তে পারেন।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার

ব্রেস্ট ক্যান্সার

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রোগী নির্দেশিকা

ডাঃ রুবিনা সুলতানার চেম্বারসমূহ