রেডিওথেরাপি কী? কখন প্রয়োজন, কীভাবে কাজ করে, চিকিৎসা পদ্ধতি ও সম্পূর্ণ রোগী নির্দেশিকা

⏱️ পড়তে সময় লাগবে: আনুমানিক ১৮–২০ মিনিট

এই রোগী নির্দেশিকায় রেডিওথেরাপি কী, কীভাবে কাজ করে, কখন প্রয়োজন হয়, বিভিন্ন ধরনের রেডিওথেরাপি, চিকিৎসার ধাপ, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, প্রস্তুতি, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন এবং চিকিৎসাকালীন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

রেডিওথেরাপি কী?

রেডিওথেরাপি (Radiotherapy বা Radiation Therapy) হলো ক্যান্সারের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতি, যেখানে উচ্চ-শক্তির রেডিয়েশন ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রোগের ধরন, স্টেজ ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য অনুযায়ী এটি নিরাময়, রোগ নিয়ন্ত্রণ বা উপসর্গ উপশমের জন্য ব্যবহার করা হয়।

রেডিওথেরাপি মূলত নির্দিষ্ট টিউমার বা চিকিৎসার এলাকাকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়। আধুনিক চিকিৎসা পরিকল্পনার মাধ্যমে টিউমারে প্রয়োজনীয় ডোজ দেওয়ার পাশাপাশি আশেপাশের সুস্থ টিস্যু ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টা করা হয়।

বর্তমানে IMRT, VMAT, IGRT, SBRT এবং ব্র্যাকিথেরাপির মতো আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে আরও নির্ভুলভাবে রেডিওথেরাপি দেওয়া সম্ভব। স্তন ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সার, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং বিভিন্ন ধরনের টিউমারসহ অনেক ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

রেডিওথেরাপি কেন ও কখন দেওয়া হয়?

সব ক্যান্সার রোগীর রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয় না। ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, রোগীর সামগ্রিক অবস্থা এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে Radiation Oncologist নির্ধারণ করেন রেডিওথেরাপি প্রয়োজন কি না এবং কখন দেওয়া হবে।

কোন কোন ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়?

অনেক ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রোগের ধরন, স্টেজ ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য অনুযায়ী এটি একা অথবা সার্জারি, কেমোথেরাপি ও অন্যান্য systemic therapy-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হতে পারে।

রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হবে কি না, কোন পদ্ধতিতে দেওয়া হবে এবং কত ডোজ ও ফ্র্যাকশন প্রয়োজন হবে—এসব বিষয় ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, প্যাথলজি, ইমেজিং এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তাই একই ধরনের ক্যান্সার হলেও চিকিৎসা পরিকল্পনা রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে।

রেডিওথেরাপি কীভাবে কাজ করে?

রেডিওথেরাপি ক্যান্সার কোষের DNA-তে ক্ষতি সৃষ্টি করে, ফলে তাদের বৃদ্ধি ও বিভাজন বন্ধ হয়ে যায় এবং সময়ের সঙ্গে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস হয়। স্বাভাবিক কোষও কিছুটা প্রভাবিত হতে পারে, তবে অনেক স্বাভাবিক টিস্যু ক্যান্সার কোষের তুলনায় ক্ষতি মেরামত করার বেশি ক্ষমতা রাখে।

রেডিওথেরাপি কীভাবে দেওয়া হয়? চিকিৎসা প্রক্রিয়া ও ধাপসমূহ

রেডিওথেরাপি শুরু করার আগে রোগের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান ও রোগীর সামগ্রিক অবস্থা অনুযায়ী একটি ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী Linear Accelerator বা প্রয়োজন হলে ব্র্যাকিথেরাপির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

১. বিশেষজ্ঞ পরামর্শ

Radiation Oncologist রোগীর চিকিৎসার ইতিহাস, বায়োপসি এবং প্রয়োজনীয় CT, MRI, PET-CT বা অন্যান্য পরীক্ষার ফলাফল মূল্যায়ন করে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন ও উপযুক্ত পদ্ধতি নির্ধারণ করেন।

২. CT Simulation

চিকিৎসার নির্দিষ্ট অবস্থানে রোগীর CT Scan করা হয়। প্রয়োজন হলে Immobilization Device বা Mask ব্যবহার করা হয়, যাতে প্রতিবার একই অবস্থানে নির্ভুলভাবে চিকিৎসা দেওয়া যায়।

৩. টিউমার ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চিহ্নিতকরণ

CT-এর ছবিতে টিউমার বা চিকিৎসার লক্ষ্য এবং আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্বাভাবিক অঙ্গগুলো (Organs at Risk) চিহ্নিত করা হয়।

৪. Treatment Planning

বিশেষ কম্পিউটার সফটওয়্যারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ডোজ, ফ্র্যাকশনের সংখ্যা এবং উপযুক্ত রেডিওথেরাপি প্রযুক্তি যেমন 3D-CRT, IMRT, VMAT বা SBRT অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়।

৫. Quality Assurance

চিকিৎসা শুরুর আগে Medical Physicist পরিকল্পনাটি যাচাই করেন, যাতে নির্ধারিত ডোজ ও চিকিৎসা পরিকল্পনা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা যায়।

৬. প্রতিদিনের রেডিওথেরাপি

প্রয়োজনে IGRT-এর মাধ্যমে রোগীর অবস্থান যাচাই করে Linear Accelerator দিয়ে রেডিয়েশন দেওয়া হয়। রেডিয়েশন দেওয়ার সময় সাধারণত কয়েক মিনিট লাগে এবং বাহ্যিক রেডিওথেরাপি সাধারণত ব্যথাহীন।

৭. চিকিৎসাকালীন মূল্যায়ন

চিকিৎসা চলাকালীন Radiation Oncologist রোগীর অবস্থা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়মিত মূল্যায়ন করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসা দেন।

৮. চিকিৎসা শেষে ফলো-আপ

চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর রোগের ধরন ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ করা হয় এবং প্রয়োজন হলে শারীরিক পরীক্ষা, CT, MRI, PET-CT বা অন্যান্য পরীক্ষা করা হতে পারে।

রেডিওথেরাপি শুরুর আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন?

রেডিওথেরাপি শুরুর আগে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট, চলমান ওষুধ, শারীরিক সমস্যা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশ্ন Radiation Oncologist-এর সঙ্গে আলোচনা করে চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিওথেরাপি দিতে কত সময় লাগে?

রেডিওথেরাপির প্রতিটি সেশন সাধারণত ১০–২০ মিনিট সময় নিতে পারে। এর মধ্যে রোগীকে চিকিৎসার জন্য সঠিক অবস্থানে রাখা, প্রয়োজন হলে ইমেজিং বা IGRT-এর মাধ্যমে অবস্থান যাচাই করা এবং চিকিৎসা সম্পন্ন করার সময় অন্তর্ভুক্ত থাকে। প্রকৃত রেডিয়েশন দেওয়ার সময় অনেক ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়, যদিও এটি ব্যবহৃত প্রযুক্তি ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।

রেডিওথেরাপিতে কত ডোজ রেডিয়েশন দেওয়া হয়?

রেডিওথেরাপির ডোজ সবার জন্য একই নয়। ডোজ Gray (Gy) এককে মাপা হয় এবং ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।

অনেক ক্যান্সারের নিরাময়মূলক (curative) বাহ্যিক রেডিওথেরাপিতে মোট প্রায় ৫০–৬০ Gy বা এর কাছাকাছি ডোজ ব্যবহার করা হতে পারে। এই মোট ডোজ সাধারণত কয়েকটি সেশনে ভাগ করে দেওয়া হয়; প্রচলিত চিকিৎসায় প্রতি সেশনে প্রায় ১.৮–২ Gy দেওয়া হতে পারে।

তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ডোজ বা একই সংখ্যক সেশন প্রয়োজন হয় না। নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে hypofractionated radiotherapy, SBRT বা SRS-এর মাধ্যমে কম সংখ্যক সেশনে তুলনামূলক বেশি ডোজ দেওয়া যেতে পারে।

উপসর্গ উপশমের (palliative) জন্যও কম সংখ্যক সেশনে রেডিওথেরাপি দেওয়া যায়। যেমন, ক্যান্সার হাড়ে ছড়িয়ে ব্যথা হলে ৮ Gy এক সেশনে, অথবা ২০ Gy ৫ সেশনে কিংবা ৩০ Gy ১০ সেশনে দেওয়া যেতে পারে। কোনটি উপযুক্ত হবে তা রোগীর অবস্থা, রোগের বিস্তার ও চিকিৎসার লক্ষ্য অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়।

তাই রেডিওথেরাপির নির্দিষ্ট ডোজ রোগীভেদে ভিন্ন। পূর্ববর্তী রেডিওথেরাপি, টিউমারের অবস্থান এবং আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের নিরাপত্তাও ডোজ নির্ধারণে বিবেচনা করা হয়।

রেডিওথেরাপি কতদিন দিতে হয়?

রেডিওথেরাপি কতদিন দিতে হবে, তা ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান, চিকিৎসার উদ্দেশ্য এবং ব্যবহৃত রেডিওথেরাপি পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে মাত্র ১টি সেশনই যথেষ্ট হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ ধরে চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। তাই সবার চিকিৎসার সময়কাল এক নয়।

অনেক ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি সপ্তাহে ৫ দিন দেওয়া হয়। তবে ক্যান্সারের ধরন ও চিকিৎসার পরিকল্পনা অনুযায়ী ফ্র্যাকশনের সংখ্যা এবং সময়সূচি ভিন্ন হতে পারে।

আধুনিক hypofractionated ও stereotactic radiotherapy-এর কারণে নির্বাচিত অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কম সংখ্যক ফ্র্যাকশনে চিকিৎসা সম্পন্ন করা সম্ভব। চূড়ান্ত সময়সূচি রোগের বৈশিষ্ট্য ও ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।

রেডিওথেরাপির পর ক্যান্সার আবার হতে পারে কি?

হ্যাঁ, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির পর ক্যান্সার আবার হতে পারে। এর অর্থ সবসময় চিকিৎসা ব্যর্থ হয়েছে এমন নয়। চিকিৎসার পর অতি ক্ষুদ্র ক্যান্সার কোষ থেকে গেলে পরে তা বৃদ্ধি পেয়ে recurrence হতে পারে। ঝুঁকি ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসায় রোগ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল তার ওপর নির্ভর করে।

ক্যান্সার কীভাবে আবার হতে পারে?

ক্যান্সার আবার হলে কি চিকিৎসা করা যায়?

হ্যাঁ। অনেক ক্ষেত্রে recurrence-এর চিকিৎসা করা সম্ভব। চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সার কোথায় ফিরে এসেছে, কতটা ছড়িয়েছে এবং আগে কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল তার ওপর। স্থানীয় বা সীমিত recurrence-এ নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে সার্জারি বা রেডিওথেরাপি বিবেচনা করা যেতে পারে। দূরবর্তী recurrence-এ ক্যান্সারের ধরন অনুযায়ী কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, targeted therapy, immunotherapy বা অন্যান্য systemic treatment ব্যবহার করা হতে পারে।

আগে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়ে থাকলে একই এলাকায় পুনরায় রেডিওথেরাপি দেওয়ার আগে আগের ডোজ, চিকিৎসার ক্ষেত্র এবং আশেপাশের অঙ্গের নিরাপত্তা বিবেচনা করা হয়। তাই re-irradiation সব রোগীর জন্য উপযুক্ত নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী imaging, restaging, biopsy বা biomarker testing করা হতে পারে।

রেডিওথেরাপির পর কি নতুন ক্যান্সারও হতে পারে?

খুব অল্প সংখ্যক রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির বহু বছর পরে নতুন একটি ক্যান্সারের ঝুঁকি কিছুটা বাড়তে পারে। এটি recurrence নয়, বরং একটি নতুন ক্যান্সার। এই ঝুঁকি সাধারণত খুব কম এবং অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির সম্ভাব্য উপকারের তুলনায় অনেক কম।

রেডিওথেরাপির পর নিয়মিত ফলো-আপ কেন প্রয়োজন?

রেডিওথেরাপির পর নিয়মিত follow-up গুরুত্বপূর্ণ। রোগের ধরন ও স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসক প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা, imaging বা অন্যান্য পরীক্ষা নির্ধারণ করেন। নতুন বা অস্বাভাবিক কোনো উপসর্গ দেখা দিলে নির্ধারিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত। তবে নতুন কোনো উপসর্গ দেখা দিলেই যে ক্যান্সার ফিরে এসেছে, এমন নয়।

রেডিওথেরাপি নেওয়ার সময় কি ব্যথা অনুভূত হয়?

বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (External Beam Radiotherapy বা EBRT) দেওয়ার সময় সাধারণত কোনো ব্যথা অনুভূত হয় না। রোগী নির্দিষ্ট অবস্থানে শুয়ে থাকেন এবং Linear Accelerator শরীর স্পর্শ না করেই পরিকল্পিত রেডিয়েশন দেয়। রেডিয়েশন দেখা বা অনুভব করা যায় না এবং চিকিৎসার সময় সাধারণত কয়েক মিনিট।

রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

রেডিওথেরাপির সময় বা পরে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। এগুলো চিকিৎসার স্থান, ডোজ, ফ্র্যাকশনের সংখ্যা এবং অন্যান্য চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে; সবার ক্ষেত্রে একই সমস্যা হয় না।

IMRT, VMAT ও IGRT-এর মতো আধুনিক প্রযুক্তি আশেপাশের সুস্থ অঙ্গে অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন কমাতে সাহায্য করে, তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারে না।

স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

বেশিরভাগ স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে কমে যায়।

শরীরের বিভিন্ন অংশে সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিকিৎসার স্থান অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। নিচে কিছু সাধারণ উদাহরণ দেওয়া হলো; সব রোগীর ক্ষেত্রে এগুলো দেখা যায় না।

দীর্ঘমেয়াদি বা Late Effects

কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া চিকিৎসা শেষ হওয়ার কয়েক মাস বা বছর পর দেখা দিতে পারে। এগুলোকে late effects বলা হয়।

নতুন বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপসর্গ হলে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করে এর কারণ নির্ধারণ করা যায়।

রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমানো ও নিয়ন্ত্রণ

কখন দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করবেন?

নিচের কোনো গুরুতর সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসা দলের সঙ্গে যোগাযোগ করুন:

রেডিওথেরাপি চলাকালীন খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন

রেডিওথেরাপির সময় পর্যাপ্ত পুষ্টি, পানি, বিশ্রাম এবং শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী শারীরিক সক্রিয়তা চিকিৎসা সহনীয় রাখতে সাহায্য করে। চিকিৎসার স্থান ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাসে কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন হতে পারে।

খাদ্যাভ্যাস

জীবনযাপন

রেডিওথেরাপির বিভিন্ন ধরন ও আধুনিক প্রযুক্তি

ক্যান্সারের ধরন, টিউমারের অবস্থান ও আকার, স্টেজ, চিকিৎসার উদ্দেশ্য এবং আশেপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের অবস্থার ওপর ভিত্তি করে রেডিওথেরাপির ধরন ও প্রযুক্তি নির্বাচন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমারে প্রয়োজনীয় ডোজ দেওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক অঙ্গের অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন কমানোর চেষ্টা করা হয়।

১. External Beam Radiotherapy (EBRT)

এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রেডিওথেরাপি পদ্ধতি। শরীরের বাইরে থাকা Linear Accelerator (LINAC) থেকে পরিকল্পনা অনুযায়ী টিউমার বা নির্ধারিত চিকিৎসা এলাকায় উচ্চ-শক্তির রেডিয়েশন দেওয়া হয়। স্তন, জরায়ুমুখ, ফুসফুস, মাথা ও ঘাড়, প্রোস্টেটসহ বিভিন্ন ক্যান্সারে EBRT ব্যবহার করা হয়।

২. Three-Dimensional Conformal Radiotherapy (3D-CRT)

3D-CRT-তে CT Scan-এর মাধ্যমে টিউমার ও আশেপাশের অঙ্গের ত্রিমাত্রিক তথ্য ব্যবহার করে রেডিয়েশন পরিকল্পনা করা হয়। বিমের আকৃতি ও দিক টার্গেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য করা হয়, যাতে স্বাভাবিক টিস্যুর অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন কমানো যায়।

৩. Intensity-Modulated Radiotherapy (IMRT)

IMRT-তে বিভিন্ন দিক থেকে রেডিয়েশনের তীব্রতা নিয়ন্ত্রণ করে টিউমারে প্রয়োজনীয় ডোজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। জটিল অ্যানাটমিক এলাকায় অবস্থিত টিউমারের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

৪. Volumetric Modulated Arc Therapy (VMAT)

VMAT হলো IMRT-এর একটি উন্নত পদ্ধতি, যেখানে Linear Accelerator রোগীর চারপাশে ঘুরে বিভিন্ন কোণ থেকে রেডিয়েশন দেয়। এতে জটিল টার্গেটে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে রেডিয়েশন দেওয়া যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে beam-on time কমে।

৫. Image-Guided Radiotherapy (IGRT)

IGRT-তে চিকিৎসার আগে বা প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার সময় বিশেষ ইমেজিংয়ের মাধ্যমে টিউমার বা চিকিৎসা এলাকার অবস্থান যাচাই করা হয়। প্রয়োজন হলে রোগীর অবস্থান সামান্য সমন্বয় করা হয়, যাতে রেডিয়েশন আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারিত টার্গেটে দেওয়া যায়।

৬. Stereotactic Body Radiotherapy (SBRT)

SBRT-তে অল্প সংখ্যক ফ্র্যাকশনে ছোট ও সুস্পষ্ট টিউমারে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ডোজের রেডিয়েশন দেওয়া হয়। নির্বাচিত প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুস, লিভার বা মেরুদণ্ডের কিছু টিউমার এবং নির্দিষ্ট মেটাস্ট্যাটিক টিউমারে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। রোগী নির্বাচন ও স্বাভাবিক অঙ্গের dose constraints গুরুত্বপূর্ণ।

৭. Stereotactic Radiosurgery (SRS)

SRS মস্তিষ্কের কিছু ছোট টিউমার, নির্দিষ্ট brain metastases, কিছু সৌম্য টিউমার এবং নির্বাচিত নিউরোলজিক অবস্থার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। নামের মধ্যে “Surgery” থাকলেও এতে প্রচলিত অস্ত্রোপচার করা হয় না; এটি অত্যন্ত নির্ভুল stereotactic radiation treatment।

৮. ব্র্যাকিথেরাপি (Brachytherapy)

ব্র্যাকিথেরাপিতে টিউমারের খুব কাছাকাছি বা নির্ধারিত চিকিৎসা এলাকায় একটি রেডিওঅ্যাকটিভ উৎস স্থাপন করে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন দেওয়া হয়। জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায়, বিশেষ করে definitive chemoradiation-এর ক্ষেত্রে, brachytherapy অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উপযুক্ত রোগীদের চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ। বিস্তারিত জানতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি: সম্পূর্ণ রোগী নির্দেশিকা পড়ুন।

রেডিওথেরাপির সুবিধা

রেডিওথেরাপি ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাগুলোর একটি। রোগভেদে এটি ক্যান্সার নিরাময়, স্থানীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ, পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কমানো অথবা ক্যান্সার-সম্পর্কিত উপসর্গ কমাতে ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি সার্জারি ও systemic therapy-এর সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেওয়া হয়।

রেডিওথেরাপির সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য চিকিৎসার ভূমিকা

রেডিওথেরাপি মূলত একটি স্থানীয় চিকিৎসা। তাই সব ক্যান্সার বা রোগের সব পর্যায়ে এটি প্রয়োজন হয় না। ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, বিস্তার, চিকিৎসার উদ্দেশ্য এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ভিত্তিতে এর ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়।

ক্যান্সারের চিকিৎসায় সিস্টেমিক থেরাপি

সিস্টেমিক থেরাপি হলো এমন ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা, যা সারা শরীরে পৌঁছে ক্যান্সার কোষকে লক্ষ্য করে। ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, রোগের বিস্তার, pathology, biomarker এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ভিত্তিতে এটি একা বা রেডিওথেরাপি ও সার্জারির সঙ্গে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়।

১. কেমোথেরাপি (Chemotherapy)

কেমোথেরাপিতে ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ও বিভাজন বন্ধ বা ধ্বংস করার জন্য অ্যান্টিক্যান্সার ওষুধ ব্যবহার করা হয়। রোগভেদে এটি চিকিৎসার আগে, পরে বা অন্য চিকিৎসার সঙ্গে দেওয়া হতে পারে।

রেডিওথেরাপি কি সবসময় কেমোথেরাপির সঙ্গে দিতে হয়?

না। সব রোগীর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি প্রয়োজন হয় না। ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য অনুযায়ী রেডিওথেরাপি একা বা অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্যান্সারে রেডিওথেরাপির সঙ্গে একই সময়ে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়, যাকে concurrent chemoradiotherapy বলা হয়।

২. হরমোন থেরাপি (Hormone Therapy)

হরমোন-নির্ভর ক্যান্সারে হরমোনের কার্যকারিতা কমিয়ে ক্যান্সারের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্তন ও প্রোস্টেট ক্যান্সারে এটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা।

৩. টার্গেটেড থেরাপি (Targeted Therapy)

টার্গেটেড থেরাপি ক্যান্সার কোষের নির্দিষ্ট protein, gene alteration বা molecular target-কে লক্ষ্য করে কাজ করে। অনেক ক্ষেত্রে biomarker বা molecular testing-এর মাধ্যমে উপযুক্ত চিকিৎসা নির্বাচন করা হয়।

৪. ইমিউনোথেরাপি (Immunotherapy)

ইমিউনোথেরাপি রোগীর immune system-কে ক্যান্সার কোষ শনাক্ত ও আক্রমণ করতে সাহায্য করে। নির্দিষ্ট ক্যান্সার ও উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে immune checkpoint inhibitors-সহ বিভিন্ন ধরনের immunotherapy ব্যবহার করা হয়।

৫. অন্যান্য সিস্টেমিক চিকিৎসা

ক্যান্সারের ধরন ও molecular বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী monoclonal antibody বা অন্যান্য বিশেষায়িত anticancer treatment ব্যবহার করা হতে পারে।

রেডিওথেরাপি ও সিস্টেমিক থেরাপি কি একসঙ্গে দেওয়া যায়?

হ্যাঁ। অনেক ক্যান্সারে systemic therapy রেডিওথেরাপির আগে, সঙ্গে বা পরে দেওয়া হতে পারে। কোন চিকিৎসা কখন দেওয়া হবে তা ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, রোগের বিস্তার এবং চিকিৎসার উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে।

রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির পার্থক্য

রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি দুটিই ক্যান্সারের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা, তবে এদের কাজের ধরন ভিন্ন। রেডিওথেরাপি সাধারণত শরীরের নির্দিষ্ট একটি অংশে ক্যান্সার কোষকে লক্ষ্য করে রেডিয়েশন দেওয়া হয়, আর কেমোথেরাপি ওষুধ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

ক্যান্সারের চিকিৎসা রোগের ধরন, স্টেজ, pathology, biomarker, পূর্ববর্তী চিকিৎসা এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। প্রয়োজন অনুযায়ী Radiation Oncology, Medical Oncology, Surgical Oncology এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ সমন্বিতভাবে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করেন। চূড়ান্ত চিকিৎসা সিদ্ধান্ত evidence-based guideline অনুযায়ী Oncology team-এর পরামর্শে নেওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

রেডিওথেরাপির প্রয়োজন, ডোজ ও চিকিৎসার ধরন ক্যান্সারের ধরন, স্টেজ, টিউমারের অবস্থান এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। তাই অভিজ্ঞ Radiation Oncologist-এর পরামর্শে ব্যক্তিগত চিকিৎসা পরিকল্পনা করা গুরুত্বপূর্ণ।

রেডিওথেরাপি সম্পর্কে পরামর্শ বা চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য ডাঃ রুবিনা সুলতানা-এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। রোগের বৈশিষ্ট্য ও প্রযোজ্য evidence-based guideline অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।

ব্রেস্ট ও জরায়ুমুখ ক্যান্সার: লক্ষণ, চিকিৎসা ও রোগী নির্দেশিকাসমূহ নিচে দেখুন

রেডিওথেরাপি ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রেডিওথেরাপির পাশাপাশি রোগের লক্ষণ, স্ক্রিনিং, রোগ নির্ণয়, স্টেজভিত্তিক চিকিৎসা, ব্র্যাকিথেরাপি, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং রোগীদের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের রোগী নির্দেশিকাগুলো পড়তে পারেন।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার

ব্রেস্ট ক্যান্সার

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রোগী নির্দেশিকা

ডাঃ রুবিনা সুলতানার চেম্বারসমূহ

তথ্যসূত্র ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা নির্দেশিকা