স্তনে গাঁট বা চাকা মানেই কি ক্যান্সার?

সংক্ষেপে জানুন:

স্তনে গাঁট বা শক্ত কিছু অনুভব করলে অনেকেই ভয় পেয়ে যান এবং মনে করেন এটি ক্যান্সার। কিন্তু বেশিরভাগ স্তনের গাঁটই ক্যান্সার নয়। ফাইব্রোসিস্টিক পরিবর্তন, ফাইব্রোএডিনোমা, সিস্ট, সংক্রমণ, ফ্যাট নেক্রোসিস ও লাইপোমাসহ বিভিন্ন নিরীহ কারণেও স্তনে চাকা হতে পারে। তবে কিছু স্তনের গাঁট ক্যান্সারের লক্ষণও হতে পারে। তাই নতুন কোনো গাঁট বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন হলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ।

স্তনের গাঁট বা চাকা কী?

স্তনের ভেতরে অস্বাভাবিক টিস্যু বৃদ্ধি, তরলভর্তি গঠন বা অন্য কোনো পরিবর্তনের কারণে যে অংশটি চাকা বা গাঁট হিসেবে অনুভূত হয় তাকে স্তনের গাঁট বলা হয়। এর বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে এবং সব গাঁটের চিকিৎসাও একরকম নয়।

স্তনে চাকা হওয়ার সম্ভাব্য কারণ

ফাইব্রোসিস্টিক পরিবর্তন

ফাইব্রোসিস্টিক পরিবর্তন সাধারণত ৩০ থেকে ৫০ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এতে স্তনে চাকা চাকা অনুভূতি, টান বা ব্যথা হতে পারে। মাসিকের আগে এসব উপসর্গ অনেকের বেশি অনুভূত হয় এবং মাসিক শুরু হলে বা শেষ হলে কমে যেতে পারে। এটি একটি সাধারণ ক্যান্সারবিহীন স্তনের পরিবর্তন।

ফাইব্রোএডিনোমা

ফাইব্রোএডিনোমা একটি সাধারণ ক্যান্সার নয় এমন স্তনের টিউমার, যা সাধারণত ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই হতে পারে। এটি সাধারণত গোল বা ডিম্বাকার, শক্ত বা রাবারের মতো এবং সহজে নড়াচড়া করা যায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যথা থাকে না। নিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের পর অনেক ফাইব্রোএডিনোমার ক্ষেত্রে শুধু পর্যবেক্ষণই যথেষ্ট হতে পারে; তবে এটি বড় হলে, দ্রুত বাড়তে থাকলে, উপসর্গ সৃষ্টি করলে বা পরীক্ষায় সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ব্রেস্ট সিস্ট

ব্রেস্ট সিস্ট হলো তরলভর্তি থলির মতো গঠন। এগুলো সাধারণত গোল বা ডিম্বাকার এবং নড়াচড়া করা যায়। অনেকের ক্ষেত্রে মাসিকের আগে সিস্ট বড় বা বেশি সংবেদনশীল মনে হতে পারে। আলট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায় গঠনটি তরলভর্তি নাকি কঠিন। উপসর্গযুক্ত কিছু সিস্টে সূচের মাধ্যমে তরল বের করা যেতে পারে।

ব্রেস্ট অ্যাবসেস বা সংক্রমণ

স্তনে সংক্রমণ বা অ্যাবসেস হলে সাধারণত ব্যথাযুক্ত চাকা, লালভাব, ফোলা বা স্থানটি গরম অনুভূত হতে পারে। বুকের দুধ খাওয়ানোর সময়ও এটি হতে পারে। চিকিৎসা কারণ ও অবস্থার ওপর নির্ভর করে; প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক এবং পুঁজ বের করার ব্যবস্থা করা হয়।

ফ্যাট নেক্রোসিস

স্তনে আঘাত, অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি বা অন্য কোনো কারণে ফ্যাটি টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফ্যাট নেক্রোসিস হতে পারে এবং চাকার মতো অনুভূত হতে পারে। এটি ক্যান্সার নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে নিজে থেকেই কমে যেতে পারে। তবে কখনো কখনো এটি ক্যান্সারের মতো দেখাতে পারে, তাই প্রয়োজন হলে ইমেজিং বা বায়োপসি করে নিশ্চিত করা হয়।

লাইপোমা

লাইপোমা হলো চর্বিযুক্ত টিস্যু থেকে তৈরি একটি ক্যান্সার নয় এমন টিউমার। এটি সাধারণত নরম, ধীরে বাড়ে এবং ব্যথাহীন হতে পারে। উপসর্গ, আকার বা রোগ নির্ণয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা করা হতে পারে।

ব্রেস্ট ক্যানসার

স্তনে চাকা হওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ ব্রেস্ট ক্যানসারও হতে পারে। ক্যানসারের গাঁট অনেক সময় শক্ত, অনিয়মিত বা কম নড়াচড়াযুক্ত এবং ব্যথাহীন হতে পারে। তবে ক্যানসারের গাঁট সবসময় একরকম হয় না—কিছু ক্যানসার নরম, গোলাকার বা স্পর্শে ব্যথাযুক্তও হতে পারে। তাই শুধু চাকার অনুভূতি দেখে ক্যানসার নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ব্যথাযুক্ত গাঁট কি ক্যান্সার?

ব্যথাযুক্ত গাঁট অনেক সময় সিস্ট, সংক্রমণ বা অন্যান্য নিরীহ কারণে হতে পারে। তবে ব্যথা থাকলেই গাঁট নিরাপদ—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। নতুন গাঁট, দীর্ঘদিন থাকা গাঁট বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা উচিত।

কোন লক্ষণে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

নতুন কোনো স্তনের গাঁট অনুভূত হলে, বিশেষ করে সেটি মাসিকের পরও থেকে গেলে, বড় হতে থাকলে বা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া উচিত।

গাঁট বা চাকা থাকলে কী কী পরীক্ষা করা হয়?

চাকার প্রকৃত কারণ জানতে বয়স, শারীরিক পরীক্ষার ফলাফল এবং চাকার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পরীক্ষা নির্বাচন করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রেস্ট আলট্রাসনোগ্রাম, ডায়াগনস্টিক ম্যামোগ্রাফি বা ডিজিটাল ব্রেস্ট টমোসিন্থেসিস করা হতে পারে। কোনো গঠন সন্দেহজনক হলে ইমেজিং-গাইডেড কোর নিডল বায়োপসি বা অন্য উপযুক্ত টিস্যু পরীক্ষা করা হতে পারে।

কোনো গাঁট ক্যান্সার কি না নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হলে ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা, ব্রেস্ট ইমেজিং এবং টিস্যু ডায়াগনোসিস—এই সমন্বিত মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ। সব রোগীর ক্ষেত্রে সব পরীক্ষা প্রয়োজন হয় না।

সব গাঁটের কি অপারেশন লাগে?

না। অনেক নিরীহ গাঁটের ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হয় না এবং শুধু পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট হতে পারে। ফাইব্রোএডিনোমা নিশ্চিত হওয়ার পরও সব ক্ষেত্রে অপারেশন প্রয়োজন হয় না। তবে গাঁট বড় হলে, বাড়তে থাকলে, উপসর্গ সৃষ্টি করলে বা পরীক্ষায় সন্দেহজনক বৈশিষ্ট্য থাকলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

ব্রেস্ট ক্যান্সার ও চিকিৎসা সম্পর্কে আরও জানুন

ব্রেস্ট ক্যান্সারের লক্ষণ, ম্যামোগ্রাফি ও স্ক্রিনিং, রোগ নির্ণয়, স্টেজভিত্তিক চিকিৎসা, রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং রোগীদের সাধারণ প্রশ্নের উত্তর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের রোগী নির্দেশিকাগুলো পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

স্তনে নতুন বা স্থায়ী গাঁট, অথবা ত্বক ও নিপলে অস্বাভাবিক পরিবর্তন থাকলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরীক্ষা করে গাঁটির প্রকৃতি বোঝা গেলে প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসা বা আরও পরীক্ষা করা যায়।

👉 ঢাকার অন্যতম ব্রেস্ট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুবিনা সুলতানা

ডাঃ রুবিনা সুলতানার চেম্বারসমূহ