National Institute of Cancer Research & Hospital (NICRH), Dhaka
অভিজ্ঞ জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
এই নিবন্ধটি ডাঃ রুবিনা সুলতানা কর্তৃক আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (NCCN, ASCO, ESMO)-অনুসরণে প্রণীত।
জরায়ুমুখ ক্যান্সারের স্ক্রিনিং (Pap Smear, HPV Test ও VIA)
- লক্ষণ না থাকলেও স্ক্রিনিং অত্যন্ত জরুরি
- Pap smear ক্যান্সার হওয়ার আগেই রোগ শনাক্ত করতে পারে
- HPV test ঝুঁকি নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ
- VIA কম খরচে কার্যকর স্ক্রিনিং পদ্ধতি
জরায়ুমুখ ক্যান্সার এমন একটি রোগ যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করলে সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য। স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে ক্যান্সার হওয়ার আগেই কোষের পরিবর্তন ধরা সম্ভব। নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে ক্যান্সার হওয়ার আগেই রোগ প্রতিরোধ করা যায় এবং রোগীর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
Pap smear কী?
Pap smear একটি সহজ স্ক্রিনিং পরীক্ষা যেখানে জরায়ুমুখ থেকে কোষ সংগ্রহ করে মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করা হয়। এর মাধ্যমে প্রি-ক্যান্সার পরিবর্তন (CIN-Cervical Intraepithelial Neoplasia) বা অস্বাভাবিক কোষ অনেক সময় ক্যান্সার হওয়ার আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। Pap smear জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে অস্বাভাবিক কোষ শনাক্ত করে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়। অনেকেই জানতে চান Pap smear কি ব্যথাদায়ক—সাধারণত এটি ব্যথাহীন বা খুব সামান্য অস্বস্তিকর একটি পরীক্ষা।
HPV DNA test কী?
HPV (Human Papillomavirus) সংক্রমণ হলো জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রধান কারণ। HPV DNA test-এর মাধ্যমে উচ্চ-ঝুঁকির HPV ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়, যা ভবিষ্যতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বর্তমানে অনেক আন্তর্জাতিক গাইডলাইনে HPV DNA test-কে সবচেয়ে সংবেদনশীল জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি প্রি-ক্যান্সার পরিবর্তন হওয়ার আগেই উচ্চ-ঝুঁকির HPV সংক্রমণ শনাক্ত করতে সাহায্য করে। HPV DNA test একা অথবা Pap smear-এর সাথে co-testing হিসেবে করা যেতে পারে। বিশেষ করে ৩০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
VIA (Visual Inspection with Acetic Acid) কী?
VIA একটি সহজ ও দ্রুত জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় জরায়ুমুখে হালকা ভিনেগার (অ্যাসিটিক অ্যাসিড) লাগানো হয়, তারপর ডাক্তার দেখেন কোনো অস্বাভাবিক সাদা দাগ আছে কিনা। এই সাদা দাগ থাকলে তা প্রাথমিক সমস্যা (প্রি-ক্যান্সার) হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে।
- ফলাফল সঙ্গে সঙ্গেই জানা যায়
- খুব কম খরচে করা যায়
- গ্রাম বা কম সুবিধাযুক্ত এলাকাতেও সহজে করা সম্ভব
HPV test ও Pap smear বেশি নির্ভুল হলেও, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে VIA একটি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত স্ক্রিনিং পদ্ধতি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশনা অনুযায়ী, সীমিত রিসোর্স দিয়েও VIA একটি গ্রহণযোগ্য স্ক্রিনিং পদ্ধতি।
কখন স্ক্রিনিং করা উচিত?
- ২১–২৯ বছর: Pap smear প্রতি ৩ বছর অন্তর
- ৩০–৬৫ বছর: HPV test প্রতি ৫ বছর অন্তর, অথবা co-testing (HPV test ও Pap smear একসাথে) প্রতি ৫ বছর অন্তর, অথবা Pap smear প্রতি ৩ বছর অন্তর
কারা স্ক্রিনিং করবেন না?
- যাদের ৬৫ বছরের পর নিয়মিত নেগেটিভ স্ক্রিনিং রিপোর্ট রয়েছে
- যাদের জরায়ুমুখ অপসারণ (hysterectomy) হয়েছে এবং ক্যান্সারের ইতিহাস নেই
কেন স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ?
- প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা যায়
- ক্যান্সার হওয়ার আগেই চিকিৎসা সম্ভব
- মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে
লক্ষণ না থাকলেও কি পরীক্ষা দরকার?
হ্যাঁ, কারণ প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তবে যদি জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ যেমন অস্বাভাবিক রক্তপাত বা স্রাব দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত পরীক্ষা করা জরুরি।
রিপোর্ট অস্বাভাবিক হলে কী করবেন?
যদি Pap smear, HPV test বা VIA-তে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ে, তাহলে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ অনকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পরবর্তী ধাপে সাধারণত কোলপোস্কপি (colposcopy) করে জরায়ুমুখ বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয় এবং প্রয়োজন হলে biopsy করা হয়, যার মাধ্যমে রোগের ধরন ও মাত্রা নির্ণয় করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা সহজ ও সফল হয়, তাই দেরি না করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
Colposcopy কী?
Colposcopy হলো জরায়ুমুখকে একটি বিশেষ magnifying instrument (colposcope) দিয়ে বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করার পদ্ধতি। Pap smear, HPV test বা VIA-তে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে সাধারণত এই পরীক্ষা করা হয়।
এই পরীক্ষার মাধ্যমে জরায়ুমুখে কোনো অস্বাভাবিক অংশ আছে কি না তা নির্ণয় করা যায় এবং প্রয়োজন হলে সেখান থেকে biopsy নেওয়া হয়।
- কোলপোস্কপি সাধারণত আউটডোর বিভাগে করা যায়
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হয় না
- পরীক্ষার সময় সামান্য অস্বস্তি হতে পারে, তবে সাধারণত এটি সহনীয়
কোলপোস্কপির মাধ্যমে প্রি-ক্যান্সার পরিবর্তন (CIN) বা জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রাথমিক পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব, যা পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জরায়ুমুখ ক্যান্সার কি প্রতিরোধযোগ্য?
হ্যাঁ, জরায়ুমুখ ক্যান্সার একটি অত্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সার। এটি প্রধানত মানব প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণের কারণে হয়, এবং উপযুক্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করলে এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। প্রতিরোধের প্রধান দুটি উপায় হলো—HPV ভ্যাকসিনেশন এবং নিয়মিত স্ক্রিনিং।
HPV ভ্যাকসিন কিশোরী ও তরুণীদের (সাধারণত ৯–১৪ বছর বয়সে) দেওয়া হলে সবচেয়ে বেশি কার্যকর, তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরাও নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উপকৃত হতে পারেন। এই ভ্যাকসিন উচ্চ-ঝুঁকির HPV টাইপ (বিশেষ করে HPV 16 ও HPV 18) থেকে সুরক্ষা দিয়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়।
নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে ক্যান্সার হওয়ার আগেই প্রি-ক্যান্সারাস পরিবর্তন (CIN) শনাক্ত ও চিকিৎসা করা সম্ভব। বর্তমানে HPV DNA test-কে সবচেয়ে সংবেদনশীল জরায়ুমুখ ক্যান্সার স্ক্রিনিং পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে Pap smear এবং VIA (Visual Inspection with Acetic Acid) অনেক দেশে কার্যকর স্ক্রিনিং টুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—HPV ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও নিয়মিত স্ক্রিনিং চালিয়ে যেতে হবে, কারণ ভ্যাকসিন সব ধরনের অনকোজেনিক HPV সংক্রমণ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা প্রদান করে না। HPV ভ্যাকসিনেশন ও নিয়মিত স্ক্রিনিং যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে জরায়ুমুখ ক্যান্সার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতিরোধযোগ্য।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
যে কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। স্ক্রিনিংয়ের মাধ্যমে রোগ শনাক্ত হলে পরবর্তী ধাপ হলো স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা, যেখানে রোগের পর্যায় অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। চিকিৎসার সময় অনেক রোগীর মনে রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকে, তবে আধুনিক চিকিৎসায় এগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। সব ধরনের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ জানতে এখানে ক্লিক করুন।
👉 ঢাকার অন্যতম জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুবিনা সুলতানা