National Institute of Cancer Research & Hospital (NICRH), Dhaka
অভিজ্ঞ ব্রেস্ট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ
এই নিবন্ধটি ডাঃ রুবিনা সুলতানা কর্তৃক আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (NCCN, ASCO, ESMO)-অনুসরণে প্রণীত।
স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং: কখন করবেন? কখন প্রয়োজন নয়?
- সবাইকে একভাবে স্ক্রিনিং দরকার হয় না—ঝুঁকি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে হয়
- ম্যামোগ্রাফি প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার ধরতে সাহায্য করে, তবে সব ক্ষেত্রে নির্ভুল নয়
- লক্ষণ থাকলে স্ক্রিনিং নয়—সরাসরি ডায়াগনস্টিক মূল্যায়ন প্রয়োজন
স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার ফলাফল অনেক ভালো হয়। তবে স্ক্রিনিং সব রোগীর জন্য একইভাবে প্রযোজ্য নয়। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মূল্যায়ন অনুযায়ী স্ক্রিনিং করা সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি।
কাদের স্ক্রিনিং করা উচিত?
- ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী নারীদের নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি স্ক্রিনিং করা উচিত (সাধারণত প্রতি ১–২ বছর অন্তর)
- যাদের পরিবারে স্তন ক্যান্সারের ইতিহাস আছে (মা, বোন বা কন্যা), তাদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং আগে শুরু করা প্রয়োজন হতে পারে
- উচ্চ ঝুঁকির নারীদের (যেমন BRCA মিউটেশন, শক্তিশালী পারিবারিক ইতিহাস) ক্ষেত্রে কম বয়স থেকে এবং ম্যামোগ্রাফির সাথে MRI যুক্ত করে স্ক্রিনিং করা হতে পারে
- প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে বয়স, ঝুঁকি ও অন্যান্য ফ্যাক্টর অনুযায়ী স্ক্রিনিং পরিকল্পনা ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ করা উচিত
লক্ষণ না থাকলেও কি স্ক্রিনিং দরকার?
হ্যাঁ, কারণ অনেক ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণ থাকে না। তবে যদি স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ দেখা দেয় বা স্তনে গাঁট বা চাকা অনুভব হয়, তাহলে দ্রুত স্ক্রিনিং করা জরুরি। স্ক্রিনিংয়ে সমস্যা ধরা পড়লে পরবর্তী ধাপ হলো স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা।
কখন স্ক্রিনিং নয়, সরাসরি ডায়াগনোসিস প্রয়োজন?
- স্তনে শক্ত বা অনিয়মিত গাঁট বা চাকা
- ত্বকে ডিম্পলিং বা পরিবর্তন
- নিপল ভিতরে ঢুকে যাওয়া
- রক্তমিশ্রিত নিপল ডিসচার্জ
ম্যামোগ্রাফি কী?
ম্যামোগ্রাফি হলো স্তনের একটি স্ক্রিনিং পরীক্ষা, যা একটি বিশেষ এক্স-রে প্রযুক্তির মাধ্যমে করা হয়। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ছোট টিউমার বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন অনেক সময় লক্ষণ প্রকাশের আগেই শনাক্ত করা সম্ভব। নির্দিষ্ট বয়সের পর বা ঝুঁকি বেশি থাকলে এটি নিয়মিত করা হয়, যাতে স্তন ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে। তবে ম্যামোগ্রাফি শতভাগ নির্ভুল নয়—বিশেষ করে dense breast থাকলে এর sensitivity কম হতে পারে। তাই কোনো উপসর্গ বা ক্লিনিক্যাল সন্দেহ থাকলে অতিরিক্ত পরীক্ষা (যেমন আল্ট্রাসাউন্ড, MRI বা বায়োপসি) প্রয়োজন হতে পারে।
Dense Breast কী?
কিছু নারীর স্তনে glandular tissue বেশি থাকলে তাকে “dense breast” বলা হয়। Dense breast থাকলে ম্যামোগ্রাফিতে ছোট টিউমার শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে, কারণ স্বাভাবিক dense tissue এবং টিউমার—দুটিই সাদা দেখাতে পারে।
এই কারণে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ইমেজিং যেমন breast ultrasound বা MRI প্রয়োজন হতে পারে। তবে dense breast মানেই ক্যান্সার নয়। রিপোর্ট, বয়স, ঝুঁকি ও উপসর্গ অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পরবর্তী মূল্যায়ন নির্ধারণ করেন।
ম্যামোগ্রাফি নেগেটিভ হলেও কি ক্যান্সার থাকতে পারে?
হ্যাঁ। বিশেষ করে dense breast থাকলে ম্যামোগ্রাফির sensitivity কম হতে পারে এবং অতিরিক্ত ইমেজিং প্রয়োজন হতে পারে। তাই রিপোর্ট স্বাভাবিক হলেও লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
BI-RADS কী? ম্যামোগ্রাফি রিপোর্ট কীভাবে বোঝা হয়?
ম্যামোগ্রাফি বা breast imaging রিপোর্ট সাধারণত BI-RADS (Breast Imaging Reporting and Data System) নামে একটি আন্তর্জাতিক শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে রিপোর্টে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না এবং পরবর্তী করণীয় কী হতে পারে তা বোঝানো হয়।
- BI-RADS 0: রিপোর্ট সম্পূর্ণ নয় — অতিরিক্ত ইমেজিং প্রয়োজন হতে পারে
- BI-RADS 1: স্বাভাবিক রিপোর্ট, কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি
- BI-RADS 2: ক্যান্সার নয় এমন পরিবর্তন (benign findings), সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়
- BI-RADS 3: ক্যান্সারের সম্ভাবনা খুব কম, তবে নির্দিষ্ট সময় পর পুনরায় ফলো-আপ ইমেজিং প্রয়োজন হতে পারে
- BI-RADS 4: সন্দেহজনক পরিবর্তন — ক্যান্সার আছে কি না নিশ্চিত করতে সাধারণত বায়োপসি প্রয়োজন হয়
- BI-RADS 5: ক্যান্সারের সম্ভাবনা অনেক বেশি — দ্রুত বায়োপসি ও চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন
- BI-RADS 6: বায়োপসিতে ইতোমধ্যে ক্যান্সার নিশ্চিত হয়েছে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধুমাত্র BI-RADS রিপোর্ট দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। রোগীর বয়স, উপসর্গ, ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, MRI এবং প্রয়োজন হলে বায়োপসির ফলাফল একসাথে মূল্যায়ন করা হয়।
👉 যদি রিপোর্টে BI-RADS 4 বা 5 উল্লেখ থাকে, তাহলে দেরি না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে পরবর্তী ধাপে স্তনের গাঁট বা অস্বাভাবিক পরিবর্তনের মূল্যায়ন এবং বায়োপসি প্রয়োজন হতে পারে।
ডাক্তার দ্বারা স্তন পরীক্ষা (Clinical Breast Examination)
Clinical Breast Examination (CBE) হলো প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে স্তন পরীক্ষা, যার মাধ্যমে গাঁট বা অন্যান্য অস্বাভাবিক পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়।
- উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের ক্ষেত্রে নিয়মিত ফলো-আপে করা যেতে পারে
- লক্ষণ (যেমন গাঁট, ব্যথা বা নিপল থেকে রক্তপাত) থাকলে এটি গুরুত্বপূর্ণ ডায়াগনস্টিক ধাপ
- ম্যামোগ্রাফি বা আল্ট্রাসাউন্ডের সাথে সমন্বয় করে মূল্যায়ন করা হয়
👉 শুধুমাত্র স্ক্রিনিংয়ের জন্য CBE সাধারণত ব্যবহৃত হয় না, তবে উপসর্গ থাকলে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মূল্যায়ন। কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে দেরি না করে দ্রুত ডায়াগনস্টিক করা উচিত। স্তনে কোনো অস্বাভাবিকতা থাকলে সাধারণত “Triple Assessment” করা হয়—ক্লিনিকাল পরীক্ষা, ইমেজিং (ম্যামোগ্রাফি/আল্ট্রাসাউন্ড) এবং বায়োপসি।
নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (Self Breast Examination)
নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (Self Breast Examination বা SBE) মূলত “breast awareness” বা নিজের স্তনের স্বাভাবিক গঠন সম্পর্কে সচেতন থাকার একটি উপায়। কোনো নতুন পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করাই এর উদ্দেশ্য।
কীভাবে করবেন?
- মাসে ১ বার, সাধারণত মাসিক শেষ হওয়ার ৫–৭ দিনের মধ্যে
- পোশাক খুলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তনের আকার, আকৃতি ও ত্বকের পরিবর্তন লক্ষ্য করুন
- দুই হাত মাথার উপর তুলে আবার একইভাবে পর্যবেক্ষণ করুন
- ত্বকে ডিম্পলিং, লালচে ভাব, ফোলা বা নিপল ভেতরে ঢুকে যাওয়া আছে কি না দেখুন
- শুয়ে বা দাঁড়িয়ে হাতের আঙুলের প্যাড দিয়ে বৃত্তাকারে বা ওপর-নিচ (vertical strip) পদ্ধতিতে পুরো স্তন ও বগল ধীরে ধীরে পরীক্ষা করুন
কখন সতর্ক হবেন?
- নতুন গাঁট বা শক্ত অংশ অনুভব হলে
- স্তনের আকার বা আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন হলে
- ত্বকের রং পরিবর্তন, ডিম্পলিং বা আলসার দেখা দিলে
- স্তনবৃন্ত থেকে রক্ত বা অস্বাভাবিক স্রাব হলে (গর্ভাবস্থা বা স্তন্যদান ছাড়া)
- বগলে কোনো ফোলা বা গাঁট অনুভূত হলে
- এক জায়গায় স্থায়ী ব্যথা (non-cyclical pain) থাকলে
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- Self Breast Examination একমাত্র স্ক্রিনিং পদ্ধতি নয়
- এটি শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য
- যেকোনো পরিবর্তন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
- বয়স ও ঝুঁকি অনুযায়ী নিয়মিত ক্লিনিকাল পরীক্ষা ও ম্যামোগ্রাফি বেশি কার্যকর
এটি কতটা কার্যকর?
নিজে নিজে পরীক্ষা করলে অনেক সময় নতুন গাঁট বা পরিবর্তন দ্রুত নজরে আসতে পারে। তবে এটি ম্যামোগ্রাফি বা অন্যান্য স্ক্রিনিং পরীক্ষার বিকল্প নয়। কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলে স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন এবং দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
বায়োপসি (Biopsy): নিশ্চিত রোগ নির্ণয়
বায়োপসি হলো এমন একটি পরীক্ষা যেখানে স্তনের সন্দেহজনক অংশ থেকে টিস্যু সংগ্রহ করে ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। এটি স্তন ক্যান্সার নিশ্চিত করার সবচেয়ে নির্ভুল পদ্ধতি।
- ইমেজিং বা ক্লিনিকাল পরীক্ষায় সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে বায়োপসি করা হয়
- সাধারণত Needle biopsy (Core biopsy বা FNAC) ব্যবহার করা হয়
- রিপোর্টের মাধ্যমে ক্যান্সার আছে কি না, এবং থাকলে তার ধরন নির্ধারণ করা হয়
👉 শুধুমাত্র ইমেজিং রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা শুরু করা হয় না। সাধারণত বায়োপসির মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করার পর চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।
স্ক্রিনিংয়ের পর কী করবেন?
স্ক্রিনিংয়ে কোনো অস্বাভাবিকতা ধরা পড়লে পরবর্তী ধাপ হলো রোগের স্টেজ নির্ধারণ এবং চিকিৎসা পরিকল্পনা করা। স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা দেখুন।
চিকিৎসার অংশ হিসেবে অনেক সময় কেমোথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে। এই সময় রোগীদের মনে কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকে, যা সঠিক গাইডলাইনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বেস্ট ক্যান্সার বিষয়ে আরও প্রশ্ন ও উত্তর দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
যে কোনো সন্দেহজনক লক্ষণ থাকলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করলে সফলতার হার অনেক বেশি। সব ধরনের ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ জানতে এখানে ক্লিক করুন।
👉 ঢাকার অন্যতম ব্রেস্ট ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুবিনা সুলতানা