Associate Professor, Department of Radiation Oncology
National Institute of Cancer Research & Hospital (NICRH), Dhaka
জরায়ুমুখ ক্যান্সার, রেডিওথেরাপি ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞ
এই নিবন্ধটি ডাঃ রুবিনা সুলতানা কর্তৃক আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (NCCN, ASCO, ESMO)-অনুসরণে প্রণীত।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি: সম্পূর্ণ রোগী নির্দেশিকা ও FAQ

সংক্ষেপে জানুন:

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের আধুনিক চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর রেডিওথেরাপি পদ্ধতি। অনেক রোগী বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (External Beam Radiotherapy বা EBRT) এবং কেমোথেরাপি সম্পন্ন করার পর জানতে চান—ব্র্যাকিথেরাপি কেন প্রয়োজন এবং এটি না নিলে কী হতে পারে।

আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে অগ্রসর (locally advanced) জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি প্রায়ই চিকিৎসার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি টিউমারের ভেতরে বা খুব কাছাকাছি উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন পৌঁছে দিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।

ব্র্যাকিথেরাপি কী?

ব্র্যাকিথেরাপি হলো একটি বিশেষ ধরনের অভ্যন্তরীণ রেডিওথেরাপি (Internal Radiation Therapy), যেখানে রেডিয়েশন উৎস টিউমারের খুব কাছাকাছি বা টিউমারের ভেতরে স্থাপন করা হয়।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বিশেষ যন্ত্র (Applicator) ব্যবহার করে জরায়ুমুখের নিকটবর্তী স্থানে রেডিয়েশন প্রদান করা হয়। এর ফলে টিউমারে উচ্চমাত্রার ডোজ দেওয়া সম্ভব হয়, অথচ আশপাশের স্বাভাবিক অঙ্গ যেমন মূত্রথলি ও অন্ত্র তুলনামূলকভাবে কম রেডিয়েশন পায়।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাহ্যিক রেডিওথেরাপি পুরো পেলভিক অঞ্চলে রেডিয়েশন প্রদান করলেও অনেক সময় টিউমারের কেন্দ্রে পর্যাপ্ত ডোজ নিরাপদভাবে পৌঁছানো কঠিন হয়। ব্র্যাকিথেরাপি এই সীমাবদ্ধতা দূর করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে, উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি বাদ দিলে চিকিৎসার ফলাফল উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হতে পারে। তাই চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকলে একজন অভিজ্ঞ রেডিয়েশন ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি কখন দেওয়া হয়?

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের স্টেজ, টিউমারের আকার এবং রোগের বিস্তৃতির উপর ভিত্তি করে চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি সাধারণত বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT) ও কেমোথেরাপির পর দেওয়া হয়।

স্থানীয়ভাবে অগ্রসর (Locally Advanced) জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে চিকিৎসার ধাপগুলো সাধারণত নিম্নরূপ:

  1. রোগ নির্ণয় (Biopsy)
  2. স্টেজ নির্ধারণ (MRI, CT Scan, PET-CT প্রয়োজন হলে)
  3. বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT)
  4. সাপ্তাহিক কেমোথেরাপি (Concurrent Chemotherapy)
  5. ব্র্যাকিথেরাপি
  6. নিয়মিত ফলো-আপ

রোগের ধরন ও স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা পরিকল্পনা কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। এজন্য প্রতিটি রোগীর জন্য ব্যক্তিগতকৃত (Individualized) চিকিৎসা পরিকল্পনা প্রয়োজন। বিস্তারিত জানতে দেখুন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা

ব্র্যাকিথেরাপি কীভাবে দেওয়া হয়?

ব্র্যাকিথেরাপির সময় বিশেষ Applicator জরায়ুমুখের নিকটবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। Applicator স্থাপনের পর CT Scan বা MRI-এর মাধ্যমে চিকিৎসা পরিকল্পনা (Treatment Planning) করা হয় যাতে টিউমারে সঠিক মাত্রার রেডিয়েশন পৌঁছানো যায়।

আধুনিক Image-Guided Brachytherapy (IGBT) প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমার এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহকে বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। বর্তমানে CT-guided ও MRI-guided ব্র্যাকিথেরাপি ব্যবহার করে টিউমারের অবস্থান আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, যা চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়াতে এবং মূত্রথলি, অন্ত্র ও অন্যান্য স্বাভাবিক অঙ্গের অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন কমাতে সাহায্য করে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী একই দিন বা অল্প সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারেন। তবে চিকিৎসা পদ্ধতি ও রোগীর অবস্থা অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে।

ব্র্যাকিথেরাপি কতটি সেশন লাগে?

ব্র্যাকিথেরাপির সেশন সংখ্যা নির্ভর করে রোগের স্টেজ, টিউমারের আকার, পূর্বে প্রদত্ত রেডিওথেরাপির ডোজ এবং ব্যবহৃত চিকিৎসা প্রোটোকলের উপর।

বর্তমানে ব্যবহৃত High Dose Rate (HDR) Brachytherapy-তে সাধারণত একাধিক সেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়। তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা প্রতিটি রোগীর ক্ষেত্রে আলাদা হতে পারে।

চিকিৎসক আপনার ক্লিনিক্যাল অবস্থা, ইমেজিং রিপোর্ট এবং রেডিওথেরাপি পরিকল্পনার ভিত্তিতে সঠিক চিকিৎসা সূচি নির্ধারণ করবেন।

ব্র্যাকিথেরাপির সুবিধা কী?

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি জরায়ুমুখ ক্যান্সারের নিরাময়মূলক (Curative) চিকিৎসার অন্যতম প্রধান উপাদান।

ব্র্যাকিথেরাপির সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

অধিকাংশ রোগী ব্র্যাকিথেরাপি ভালোভাবে সহ্য করতে পারেন। তবে অন্যান্য চিকিৎসার মতো কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

তবে আধুনিক CT-guided ও MRI-guided ব্র্যাকিথেরাপি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

ব্র্যাকিথেরাপির পরে কী কী সতর্কতা মানতে হবে?

চিকিৎসার পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অস্বাভাবিক রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, জ্বর বা নতুন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।

সারসংক্ষেপ

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাহ্যিক রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপির পাশাপাশি ব্র্যাকিথেরাপি টিউমারে কার্যকর ডোজ পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য অভিজ্ঞ রেডিয়েশন ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

ব্র্যাকিথেরাপি কি ব্যথাদায়ক?

বেশিরভাগ রোগীর ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি সহনীয়। Applicator স্থাপনের সময় প্রয়োজনে অ্যানেস্থেসিয়া বা সেডেশন ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসার পরে সামান্য অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে, যা সাধারণত সাময়িক।

ব্র্যাকিথেরাপি না নিলে কী হতে পারে?

নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি বাদ দিলে টিউমারে পর্যাপ্ত ডোজ পৌঁছানো কঠিন হতে পারে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা কমে যেতে পারে।

শুধু রেডিওথেরাপি নিলেই হবে?

অনেক ক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT) যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী অনেক রোগীর জন্য EBRT-এর পাশাপাশি ব্র্যাকিথেরাপিও প্রয়োজন হয়।

ব্র্যাকিথেরাপি কতটি সেশন লাগে?

সেশন সংখ্যা রোগীর অবস্থা, স্টেজ এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার উপর নির্ভর করে। প্রতিটি রোগীর জন্য চিকিৎসা পরিকল্পনা আলাদা হতে পারে।

ব্র্যাকিথেরাপি কতক্ষণ সময় লাগে?

Applicator স্থাপন, ইমেজিং এবং চিকিৎসাসহ পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তবে প্রকৃত রেডিয়েশন প্রদানের সময় সাধারণত অনেক কম হয়।

ব্র্যাকিথেরাপির জন্য হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় কি?

চিকিৎসা পদ্ধতি ও কেন্দ্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য ভর্তি থাকতে হয়, আবার কিছু ক্ষেত্রে ডে-কেয়ার ভিত্তিতেও চিকিৎসা সম্পন্ন করা যায়।

ব্র্যাকিথেরাপির পরে কি স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করা যায়?

হ্যাঁ। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার পর স্বাভাবিক দৈনন্দিন কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারেন। তবে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিশ্রাম ও ফলো-আপ মেনে চলা উচিত।

ব্র্যাকিথেরাপির পরে কি সন্তান ধারণ সম্ভব?

চিকিৎসার ধরন, রোগের স্টেজ এবং ব্যবহৃত রেডিওথেরাপির উপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজনন ক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। চিকিৎসা শুরুর আগে এ বিষয়ে চিকিৎসকের সাথে আলোচনা করা উচিত।

ব্র্যাকিথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি স্থায়ী হয়?

বেশিরভাগ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাময়িক। তবে কিছু দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন হতে পারে, যা নিয়মিত ফলো-আপ ও যথাযথ পরামর্শের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।

ব্র্যাকিথেরাপি কি চিকিৎসার সাফল্য বাড়ায়?

উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি টিউমারে কার্যকর ডোজ পৌঁছাতে সাহায্য করে এবং চিকিৎসার ফলাফল উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ব্র্যাকিথেরাপির আগে কী কী পরীক্ষা লাগতে পারে?

রোগের স্টেজ, পূর্ববর্তী চিকিৎসা এবং সামগ্রিক শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা, ইমেজিং এবং চিকিৎসা মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।

ব্র্যাকিথেরাপির পরে ফলো-আপ কতদিন করতে হয়?

চিকিৎসা সম্পন্ন হওয়ার পরে নিয়মিত ফলো-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসক রোগের অবস্থা অনুযায়ী ফলো-আপ সূচি নির্ধারণ করবেন।

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি প্রায়ই নিরাময়মূলক চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকলে একজন অভিজ্ঞ রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

👉 ঢাকার অন্যতম জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুবিনা সুলতানা

ডাঃ রুবিনা সুলতানার চেম্বারসমূহ