Associate Professor, Department of Radiation Oncology
National Institute of Cancer Research & Hospital (NICRH), Dhaka
জরায়ুমুখ ক্যান্সার, রেডিওথেরাপি ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞ
এই নিবন্ধটি ডাঃ রুবিনা সুলতানা কর্তৃক আন্তর্জাতিক গাইডলাইন (NCCN, ASCO, ESMO)-অনুসরণে প্রণীত।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি: রোগীদের জন্য বিস্তারিত তথ্য

⏱️ পড়তে সময় লাগবে: আনুমানিক ৮–১০ মিনিট

এই নির্দেশিকায় জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, কখন ও কীভাবে দেওয়া হয়, এর সম্ভাব্য সুবিধা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং রোগীদের সাধারণ প্রশ্নের সহজ ভাষায় বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

সংক্ষেপে জানুন:

ব্র্যাকিথেরাপি কী?

ব্র্যাকিথেরাপি হলো একটি বিশেষ ধরনের অভ্যন্তরীণ রেডিওথেরাপি (Internal Radiation Therapy), যেখানে টিউমারের খুব কাছাকাছি বা ভেতরে সরাসরি রেডিয়েশন দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, স্থানীয়ভাবে অগ্রসর (Locally Advanced) জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এটি চিকিৎসার অপরিহার্য অংশ।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বিশেষ যন্ত্র (Applicator) ব্যবহার করে জরায়ুমুখের নিকটবর্তী স্থানে রেডিয়েশন প্রদান করা হয়। এর ফলে টিউমারে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন দেওয়া সম্ভব হয়, অথচ আশপাশের স্বাভাবিক অঙ্গ, যেমন মূত্রথলি ও অন্ত্র, তুলনামূলকভাবে কম রেডিয়েশন পায়। এই কারণেই ব্র্যাকিথেরাপি টিউমার নিয়ন্ত্রণ এবং সম্পূর্ণ নিরাময়ের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারে ব্র্যাকিথেরাপি কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT) পুরো পেলভিক অঞ্চলে রেডিয়েশন প্রদান করলেও অনেক সময় টিউমারের ভেতরে পর্যাপ্ত মাত্রার রেডিয়েশন নিরাপদভাবে দেওয়া সম্ভব হয় না। ব্র্যাকিথেরাপি এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে সাহায্য করে।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি বাদ দিলে চিকিৎসার ফলাফল খারাপ হতে পারে। তাই চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকলে একজন অভিজ্ঞ রেডিয়েশন ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি কখন দেওয়া হয়?

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসা রোগের স্টেজ, টিউমারের আকার এবং রোগীর সামগ্রিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। স্থানীয়ভাবে অগ্রসর (Locally Advanced) জরায়ুমুখ ক্যান্সারের অনেক রোগীর ক্ষেত্রে বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT) ও সমসাময়িক কেমোথেরাপির (Concurrent Chemoradiotherapy) পর ব্র্যাকিথেরাপি চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেওয়া হয়।

তবে সব রোগীর চিকিৎসা পরিকল্পনা এক নয়। ব্র্যাকিথেরাপির প্রয়োজন, সময় এবং পদ্ধতি রোগের অবস্থা ও চিকিৎসা পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। জরায়ুমুখ ক্যান্সারের স্টেজভিত্তিক সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পড়ুন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসা

ব্র্যাকিথেরাপি কীভাবে দেওয়া হয়?

ব্র্যাকিথেরাপির সময় বিশেষ একটি যন্ত্র (Applicator) জরায়ুমুখের নিকটবর্তী স্থানে স্থাপন করা হয়। এরপর CT Scan বা MRI-এর মাধ্যমে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়, যাতে টিউমারে সঠিক মাত্রার রেডিয়েশন দেওয়া যায় এবং আশপাশের স্বাভাবিক অঙ্গ যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা যায়।

আধুনিক ইমেজ-গাইডেড ব্র্যাকিথেরাপি (IGBT) প্রযুক্তির মাধ্যমে টিউমার এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিবেচনায় রেখে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়। CT-guided বা MRI-guided ব্র্যাকিথেরাপির সাহায্যে টিউমারের অবস্থান আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব, ফলে চিকিৎসা আরও কার্যকরভাবে দেওয়া যায় এবং মূত্রথলি, অন্ত্রসহ আশপাশের স্বাভাবিক অঙ্গের অপ্রয়োজনীয় রেডিয়েশন কমানো যায়।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগী একই দিন বা অল্প সময়ের মধ্যেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্মে ফিরে যেতে পারেন। তবে চিকিৎসার ধরন ও রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে কিছু ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখা হতে পারে।

ব্র্যাকিথেরাপি নেওয়ার সময় কি ব্যথা অনুভূত হয়?

ব্র্যাকিথেরাপি নেওয়ার সময় ব্যথা বা অস্বস্তি হবে কিনা, তা চিকিৎসার ধরন এবং ক্যান্সারের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। অধিকাংশ রোগী চিকিৎসার সময় তীব্র ব্যথা অনুভব করেন না। বিশেষ করে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের ব্র্যাকিথেরাপির ক্ষেত্রে রোগীর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যানেস্থেসিয়া বা সেডেশনের ব্যবস্থা করা হয়।

যদি চিকিৎসার পর তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত রক্তপাত, জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব বা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত আপনার চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

ব্র্যাকিথেরাপি কতটি সেশন লাগে?

ব্র্যাকিথেরাপির সেশন সংখ্যা রোগের স্টেজ, টিউমারের আকার এবং আগে দেওয়া রেডিওথেরাপির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়।

বর্তমানে ব্যবহৃত হাই-ডোজ রেট (High Dose Rate, HDR) ব্র্যাকিথেরাপিতে সাধারণত একাধিক সেশনের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্পন্ন করা হয়। তবে সেশন সংখ্যা একেক রোগীর ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে।

রোগের অবস্থা, বিভিন্ন পরীক্ষার ফলাফল এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার ভিত্তিতে চিকিৎসক আপনার জন্য উপযুক্ত সেশন সংখ্যা ও চিকিৎসার সময়সূচি নির্ধারণ করবেন।

ব্র্যাকিথেরাপির সুবিধা কী?

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপির অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে।

বর্তমান আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী, নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে ব্র্যাকিথেরাপি জরায়ুমুখ ক্যান্সারের নিরাময়মূলক (Curative) চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ব্র্যাকিথেরাপির সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

অধিকাংশ রোগী ব্র্যাকিথেরাপি ভালোভাবে সহ্য করতে পারেন। তবে অন্যান্য চিকিৎসার মতো এরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

স্বল্পমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

দীর্ঘমেয়াদি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

তবে আধুনিক CT-guided ও MRI-guided ব্র্যাকিথেরাপি প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

ব্র্যাকিথেরাপির পরে কী কী সতর্কতা মানতে হবে?

চিকিৎসার পরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলো-আপ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অস্বাভাবিক রক্তপাত, তীব্র ব্যথা, জ্বর বা নতুন উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

সারসংক্ষেপ

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাহ্যিক রেডিওথেরাপি (EBRT) ও কেমোথেরাপির পাশাপাশি ব্র্যাকিথেরাপি টিউমারে কার্যকরভাবে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন দিতে সাহায্য করে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোগের স্টেজ ও রোগীর অবস্থার ভিত্তিতে সঠিক চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য অভিজ্ঞ রেডিয়েশন ও ব্র্যাকিথেরাপি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জরায়ুমুখ ক্যান্সার ও চিকিৎসা সম্পর্কে আরও জানুন

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের লক্ষণ, স্ক্রিনিং, ভায়া (VIA) টেস্ট, রোগ নির্ণয়, স্টেজভিত্তিক চিকিৎসা, রেডিওথেরাপি এবং রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে নিচের রোগী নির্দেশিকাগুলো পড়তে পারেন।

বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

জরায়ুমুখ ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্র্যাকিথেরাপি প্রায়ই নিরাময়মূলক চিকিৎসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই চিকিৎসা পরিকল্পনা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন বা দ্বিধা থাকলে একজন অভিজ্ঞ রেডিয়েশন অনকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

👉 ঢাকার অন্যতম জরায়ুমুখ ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাঃ রুবিনা সুলতানা

ডাঃ রুবিনা সুলতানার চেম্বারসমূহ